বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ডেস্ক
স্টারফল শিপ যেমন দেখতে ছবি: প্রতীকী ছবি/ সংগৃহীত
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চোখের পলকে জরুরি পণ্য পৌঁছে দেওয়ার এক অবিশ্বাস্য প্রযুক্তি নিয়ে হাজির হয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্স। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল স্পেস ফোর্স স্টেশন থেকে স্পেসএক্সের একটি 'ফ্যালকন ৯' রকেট মহাকাশে পাড়ি জমাচ্ছে। এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য হলো সম্পূর্ণ নতুন এবং গোপন এক প্রযুক্তির পরীক্ষা করা, যার নাম দেওয়া হয়েছে 'স্টারফল'। এটি মূলত একটি বিশেষ ধরনের যান (রিন্ট্রি ভেহিকল), যা মহাকাশ থেকে পৃথিবীর যেকোনো স্থানে অত্যন্ত দ্রুত পণ্য বা কার্গো ডেলিভারি দিতে সক্ষম।
ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফএএ)-এর একটি পরিবেশগত মূল্যায়ন প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, স্পেসএক্স সম্পূর্ণ গোপনে এই সসার বা থালার আকৃতির যানটি তৈরি করেছে। এর মূল লক্ষ্য হলো "মহাকাশের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ" ব্যবস্থা সহজ করা।
প্রথম মহাকাশ পরীক্ষা ও অভিযান
স্টারফল যানের প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়নটি একটি বিশেষ রকেটের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে। মহাকাশে যাওয়ার পর যানটি পৃথিবীকে দুইবার প্রদক্ষিণ করবে। এরপর ফ্যালকন ৯ রকেটের ওপরের অংশটি স্টারফলকে মুক্ত করে দেবে, যাতে এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনরায় প্রবেশ করতে পারে। সবশেষে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে প্রায় ৮০০ মাইল পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগরে প্যারাসুটের সাহায্যে এটি সফলভাবে অবতরণ (স্প্ল্যাশডাউন) করবে। নিরাপত্তার স্বার্থে ইতিমধ্যেই ওই এলাকার পাইলট এবং নাবিকদের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
স্পেসএক্স এই পুরো মিশনটিকে অত্যন্ত গোপনীয় বা ক্লাসিফাইড অভিযানের মতো পরিচালনা করছে। তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে উড্ডয়নের মূল সময়সূচি দেওয়া থাকলেও, ভেতরের পণ্য বা রকেটের পরবর্তী ধাপগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্টারফল মূলত দুটি প্রধান কাজ করবে:
আকার ও কার্যক্ষমতা
স্টারফল যানটি দেখতে সিলিন্ডার আকৃতির, যার ব্যাস ১০.২ ফুট (৩.১ মিটার) এবং উচ্চতা ২.৫ ফুট (০.৭৫ মিটার)। এই যানটির নিজস্ব ওজন প্রায় ৪,৬০০ পাউন্ড (২.১ মেট্রিক টন) এবং এটি প্রায় ২,২০০ পাউন্ড (১ মেট্রিক টন) ওজনের পণ্য বহন করতে পারে, যার ফলে পণ্যসহ এর মোট ওজন দাঁড়ায় ৬,৮০০ পাউন্ড (৩.১ মেট্রিক টন)। এটি স্পেসএক্সের নভোচারী বহনকারী 'ক্রু ড্রাগন' মহাকাশযানের চেয়ে আকারে বেশ ছোট এবং এটি শুধুমাত্র পণ্য পরিবহনের জন্যই নকশা করা হয়েছে।
এই সংস্করণটি নিজে থেকে কক্ষপথ পরিবর্তন করতে পারে না, বরং এটি বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসার জন্য মূল রকেটের ওপর নির্ভর করে। প্রথম স্টারফল ডেমো মিশনটি মহাকাশে কয়েক ঘণ্টা কাটালেও, এটি ফ্যালকন ৯ বা আরও বড় স্টারশিপ রকেটের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত সাবঅরবিটাল পথ ধরেও উড়তে সক্ষম। রকেট থেকে আলাদা হওয়ার পর, থালার মতো দেখতে এই যানটি 'সংকুচিত নাইট্রোজেন গ্যাস' ব্যবহার করে নিজের দিক পরিবর্তন করে এবং হিট শিল্ডকে সঠিক মুখে রেখে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে।
প্রধান গ্রাহক কারা হতে পারে?
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় এবং সম্ভাব্য গ্রাহক হলো মার্কিন সামরিক বাহিনী (পেন্টাগন)। পেন্টাগন ইতিমধ্যেই স্পেসএক্সের সাথে 'রকেট কার্গো' বা 'পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ডেলিভারি' নামের একটি প্রজেক্টে কাজ করছে। সেখানে স্পেসএক্সের বিশাল 'স্টারশিপ' রকেট ব্যবহারের কথা রয়েছে। তবে স্টারশিপ একটি বিশাল যান (প্রায় ২০ তলা ভবনের সমান) এবং এর অবতরণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। সেই তুলনায় ছোট ও হালকা পণ্য দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য 'স্টারফল' অনেক বেশি কার্যকর ও বহুমুখী বিকল্প হতে পারে।
ব্লু অরিজিন, রকেট ল্যাব এবং অ্যান্ডুরিল-এর মতো অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও মহাকাশ থেকে পণ্য সরবরাহের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। তবে স্পেসএক্সের এই পরীক্ষা সফল হলে তা তাদের প্রতিদ্বন্দীদের চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।