❒ বীণা সিক্রির সাক্ষাৎকার
বীণা সিক্রি
দীনেশ ত্রিবেদী ছবি: সংগৃহীত
সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে নতুন হাইকমিশনার হিসেবে পাঠিয়েছে ভারত। বিজেপি নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) সরকারের ১২ বছরের শাসনামলে এই প্রথম কোনো রাজনৈতিক নেতাকে দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো।
একই সঙ্গে তাঁকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর মর্যাদাও দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। তার সঙ্গে কথা বলেছেন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিক ইয়াশি।
প্রশ্ন: রাষ্ট্রদূতদের মন্ত্রিসভার মর্যাদা দেওয়া কতটা প্রচলিত এবং এর মাধ্যমে কী বার্তা দেওয়া হয়?
বীণা সিক্রি: দীনেশ ত্রিবেদী রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কূটনীতিক। অর্থাৎ, তিনি পেশাদার কূটনীতিক নন (ভারতীয় পররাষ্ট্র দপ্তর বা আইএফএস কর্মকর্তা নন), কিন্তু তাকে দূতের দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি তাঁকে মন্ত্রিসভার সদস্যের মর্যাদাও দেওয়া হয়েছে, যা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
অতীতেও রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত দূতের উদাহরণ রয়েছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমলে এমন নিয়োগ তুলনামূলক কম। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত বিনয় মোহন কোয়াত্রা কিছুদিন আগপর্যন্ত পররাষ্ট্রসচিব ছিলেন। অবসরের পর তাকে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানো হয়েছে, তাই এটিও রাজনৈতিক নিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। আবার সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল দলবীর সিং সুহাগকে ২০১৯ সালে সিশেলসে ভারতের হাইকমিশনার করা হয়েছিল।
তবে রাষ্ট্রদূতদের মন্ত্রিসভার মর্যাদা পাওয়া খুবই বিরল ঘটনা। মোদির আমলে এই প্রথম কোনো রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত দূতকে মন্ত্রিসভার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। যদিও কংগ্রেস সরকারের সময়ে মন্ত্রিসভার মর্যাদাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতের উদাহরণ রয়েছে।
স্বাধীনতার পরপরই বিজয়া লক্ষ্মী পণ্ডিত মন্ত্রিসভার মর্যাদায় রাষ্ট্রদূত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে টি এন কৌলকে মস্কোতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানোর সময় মন্ত্রিসভার মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। ড. করণ সিং যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হওয়ার সময় একই মর্যাদা পেয়েছিলেন। আর ডি পি ধর দ্বিতীয়বার মস্কোতে রাষ্ট্রদূত হয়ে যাওয়ার সময়ও এই মর্যাদা পেয়েছিলেন।
মন্ত্রিসভার মর্যাদা দেওয়ার উদ্দেশ্য মূলত দুটি। প্রথমত, এটি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ইঙ্গিত দেয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে আপনার প্রধানমন্ত্রীর কাছে সরাসরি যাওয়ার সুযোগ থাকবে। পররাষ্ট্রসচিব বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রশাসনিক ধাপ পেরিয়ে যেতে হবে না।
দ্বিতীয়ত, এটি যে দেশে ওই রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব পালন করবেন, সেই দেশের প্রতিও একটি বার্তা বহন করে। এই ক্ষেত্রে ঢাকার উদ্দেশে বার্তাটি খুবই স্পষ্ট। এই ব্যক্তিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত উচ্চ রাজনৈতিক মর্যাদায় দেখেন। তিনি ওই দেশে বিশেষ ধরনের ভূমিকা পালন করবেন, শুধু মন্ত্রিসভার পর্যায়ের মন্ত্রী বা দেশটির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন। আর তিনি যে বার্তা পৌঁছে দেবেন, সেটিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি বার্তা হিসেবে ধরা হবে। এতে একটি বিশেষ মর্যাদা তৈরি হয় এবং আশা করা হয়, বাংলাদেশও সেটিকে গ্রহণ ও স্বীকৃতি দেবে।
প্রশ্ন: এই মর্যাদা কি বাস্তব কোনো প্রভাব ফেলে, নাকি এটি মূলত প্রতীকী? একজন মন্ত্রিসভার মর্যাদাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতকে কীভাবে সাধারণ রাষ্ট্রদূতের চেয়ে আলাদাভাবে দেখা হয়?
বীণা সিক্রি: এই বিশেষ মর্যাদার প্রভাব মূলত প্রটোকলের ক্ষেত্রে দেখা যায়। ওই ব্যক্তি যখন বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন বা দেশের ভেতরে ভ্রমণ করবেন, তখন তাঁকে সেই দেশের নিজস্ব মন্ত্রিসভার সদস্যদের মতো বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হবে। যেকোনো দেশের রাষ্ট্রদূত নিরাপত্তা ও আনুষ্ঠানিক সুবিধা পান। কিন্তু কেউ যদি মন্ত্রিসভার মর্যাদা পান, তাহলে নিরাপত্তাব্যবস্থায় বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং বৈঠক আয়োজনের ক্ষেত্রেও তাঁকে সেই দেশের নিজস্ব মন্ত্রীর সমতুল্য অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
প্রশ্ন: ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কিছু সময় ধরে পরিবর্তনশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময়ে ভারত কেন একজন পেশাদার কূটনীতিকের বদলে একজন রাজনীতিককে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল বলে আপনি মনে করেন?
বীণা সিক্রি: এটি ভারতের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ বা প্রতিবেশী সবার আগে পররাষ্ট্রনীতির প্রতি অগ্রাধিকারের ইঙ্গিত বহন করে। প্রধানমন্ত্রী মোদি বাংলাদেশে হাইকমিশনারকে মন্ত্রিসভার মর্যাদা দেওয়ার মাধ্যমে এই নীতিকে উচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে বোঝা যায়। তিনি চাইবেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারও এই বার্তা উপলব্ধি করুক এবং ভারতের সঙ্গে নীতিগত সম্পর্ককে একইভাবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিক।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক মূলত ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তখন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত সরকার সম্পর্ক অব্যাহত রাখার আগ্রহ দেখায়, কিন্তু তার প্রতিদান পায়নি। তাঁর ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী শাসনামলে ড. ইউনূস আগের প্রকল্প সিদ্ধান্ত, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং ভারতের পক্ষে নেওয়া বিশেষ সিদ্ধান্তগুলো পরিবর্তন করেন।
প্রত্যাশা ছিল, তারেক রহমান আগের ইতিবাচক ও গতিশীল বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং প্রকল্প উন্নয়ন সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের দিকে তাকাবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে ধরনের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। বরং তাঁর চীন সফর এবং সেখানে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতি আরও অনেক প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সূত্র : আজকের পত্রিকা